ব্রজগোপিনী গণ শ্রীকৃষ্ণকে পতি রূপে চেয়েছিলেন। এই কারনে তাঁহারা দেবী কাত্যায়নীর পূজো করেছিলেন।কাত্যায়নী যিনি দুর্গা- তিনি দুইভাবে লীলা কর্ম করেন।
(১) তিনি মোহ মায়া দ্বারা জড় জগতের লোকেদের আছন্ন করেন, এটি বহিরঙ্গা মায়াশক্তি।
(২) দ্বিতীয় হলো তিনি তিনি আবার "কৃষ্ণ ভক্তি" প্রদান করে ভগবানের লীলাশক্তি রূপে নানান লীলার উদঘাটন করেন। ইঁহা ভগবানের অন্তরঙ্গ চিচ্ছক্তি।
(১) তিনি মোহ মায়া দ্বারা জড় জগতের লোকেদের আছন্ন করেন, এটি বহিরঙ্গা মায়াশক্তি।
(২) দ্বিতীয় হলো তিনি তিনি আবার "কৃষ্ণ ভক্তি" প্রদান করে ভগবানের লীলাশক্তি রূপে নানান লীলার উদঘাটন করেন। ইঁহা ভগবানের অন্তরঙ্গ চিচ্ছক্তি।
শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, ভগবানের এই যোগমায়ার লীলাশক্তির বিবরণ প্রাপ্ত করা যায়। শ্রীভগবান কৃষ্ণের যখন আট বছর বয়স- তখন তিনি রাসলীলা করেছিলেন। গোপিনী গণ ছিলেন সকলেই বিবাহিত। সেযুগে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। কিন্তু তবুও তারা শ্রীকৃষ্ণকেই পুরুষোত্তম জেনে তাঁর সঙ্গ লাভ করার জন্যই কাত্যায়নী ব্রতের অনুষ্ঠান সাধন করেছিলেন। বৈষ্ণব শাস্ত্রে একে "পরকীয়া" বলে উল্লেখিত আছে। এই পরকীয়া বলতে জড় জগতের অবৈধ সম্পর্ক বোঝায় না। আপাতদৃষ্টিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই লীলা জড় জগতের যুবক যুবতীর প্রেমের মতো লাগলেও আদতে তা নয়। মহান আচার্য গণ এঁই পার্থক্য করে গেছেন। ভগবানের বংশী ধ্বনি শ্রবন করে গোপ কন্যারা ছুটে গিয়েছিলেন
অপ্রাকৃত দিব্য প্রেমের আনন্দের স্বাদ আস্বাদের জন্য। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী মহারাজ এর ব্যাখা করে বলেছেন-আত্মেন্দ্রিয়প্রীতি- বাঞ্ছা-তারে বলি "কাম"। কৃষ্ণন্দ্রিয়প্রীতি- ইচ্ছা ধরে "প্রেম" নাম।।
ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের জন্য যে ইচ্ছা তা হল কাম। শ্রীকৃষ্ণের প্রীতির জন্য যে ইচ্ছা তাঁই "দিব্য প্রেম" নামে শাস্ত্রে আখ্যায়িত। অর্থাৎ গোপিনী দের কৃষ্ণ প্রেমে মত্ত হওয়া বা বংশীর ধ্বনিতে উন্মাদের মতো কৃষ্ণ দর্শনে ছুটে যাওয়া সব "কাম" নয়- বরং দিব্য প্রেমের লক্ষণ। এই প্রেম অপ্রাকৃত, কামনা বাসনার বিষ মুক্ত, জড় জগতের কলঙ্ক মুক্ত। তাই শ্রীমদ্ভাগবত ও আচার্য গনের মতে রাসলীলার অনুকরণ করা পাপ ও অধর্ম। শ্রীকৃষ্ণ ষড় ঐশ্বর্য পূর্ণ ভগবান। আমরা সাধারন জীব যদি তাঁর নকল করে ভগবানের লীলার অনুকরণ করতে চাই- তবে নিজেই ধ্বংস হবো। যেমন পৌন্ড্রক বাসুদেব নিজেকে "কৃষ্ণ" ভেবে ধ্বংস হয়েছিল। ভগবানের ভক্তির যে পাঁচ ভাব দেখা যায় {
শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর
} ইহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হোলো মধুরা রতিভাব। রায় রামানন্দের সনে শাস্ত্র শ্রবণ কালে মহাপ্রভু এই "মাধুর্য" ভাবকেই সর্ব উত্তম বলেছিলেন। সখী ভাবে ভাবিত ভক্তের কাছে এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হলেন কান্ত বা প্রিয়। এই ভাবনা নিয়ে যে সাধনা ভজনা তাঁকেই "কৃষ্ণ প্রেম" বলে। এই ভাবে ভাবিত বা ভাবিতা সাধক সাধিকার ভাব হয় সখী ভাবের মতো। লীলা সংবরণের পূর্বে মহাপ্রভুর মধ্যে এমন সখীভাবের উদয় হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণের মথুরা গমনের পর শ্রীরাধারানীর অন্তরে যে কৃষ্ণ অদর্শনের জ্বালা ও কৃষ্ণ প্রাপ্তির আখাঙ্খা উদ্ভাষিত হয় তাঁই বৈষ্ণব দর্শনে "বিরহ" নামে খ্যাত। রাসলীলার মধ্যে প্রচুর তত্ত্ব রস লুকায়িত। বৈষ্ণব, তন্ত্র, যোগ সমস্ত সাধকেরা এর মধ্যে নানান তত্ত্ব খোঁজেন। মূল দর্শন হোলো ভক্তিমার্গ। গোপিকা গণ পড়াশোনা জানতেন না। পঞ্জিকা দেখে পূর্ণিমার দিন ক্ষণ জানতেন না। ক্ষয়িষ্ণু চন্দ্রের ধীরে ধীরে পূর্ণ অবয়ব প্রাপ্তি তারা আকাশে দেখে সেই পূর্ণিমা তিথির প্রতীক্ষা করছিলেন। কখনো কখনো তাঁদের ধৈর্যের বাঁধ টলমল করলে প্রার্থনা করতেন _ "ওহে চন্দ্র তুমিই আজই পূর্ণ রূপে প্রকাশিত হয়ে পূর্ণিমার নির্মল জ্যোৎস্না প্রদান করো।" অবশেষে শরত কালের সেই মধু রজনীতে অসংখ্য তারার মধ্যে গগনে পূর্ণ রূপে শশী আত্মপ্রকাশ করলেন। বৃন্দাবনের বৃক্ষ গুলিতে প্রকৃতি দেবী নানান পুস্পে সাজিয়ে দিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নানান পুস্পে বিশেষ ভাবে সুগন্ধ যুক্ত মল্লিকা পুস্পে সুসজ্জিত হলেন। এবং চন্দ্রালোকে প্লাবিত সেই যামিনীতে শ্রীভগবান বংশী বাজালেন। নানাজাতির পুস্পের আঘ্রানে সুবাসিত হাওয়ায় সেই কোটি অমৃত তুচ্ছ বংশীধ্বনি গোপকন্যা দের শুধু কর্ণে নয়- আত্মায় গিয়ে পৌছালো। গোপীরা সেই বংশী ধ্বনি শ্রবন করে তন্ময় হয়ে কৃষ্ণ দর্শনে ছুটলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে তাঁদের সেই দিব্য অবস্থা বর্ণিত আছে। কেহ হাতের কাজ ফেলে, কেহ রন্ধন ছেড়ে, কেহ বা কাজ কর্ম ছেড়ে, কেহ বা খাদ্য পরিবেশন ছেড়ে, কেহ স্বামী ও লোকলাজের ভয় তুচ্ছ করে ছুটলেন। কৃষ্ণ দর্শনে উম্মত্তা ব্রজ ললনারা এভাবে কৃষ্ণ দর্শনে ছুটে গেলেন। কারোর যাত্রাপথে মস্তকের ওড়না কাঁটাগাছে আটকে গেলে গোপীনি সেই ওড়না ছাড়ানো তো দূর- টান মেরেই নিয়ে গেলেন, কারোর যাত্রা পথে ফনাধারী ভুজঙ্গ উদিত হলে গোপিনীরা সেই ভুজঙ্গকেই ডিঙ্গিয়ে চলে গেলেন। বস্তুত এই ভাব দিব্য ভক্তির লক্ষণ। কাঁটাগাছ যা ভক্তি মার্গে পথিক দের পেছনে মায়া দ্বারা টানতে চায়, বিষধর ফনী হোলো লোকলাজের ভয় যা ভক্তিমার্গ কে অবরুদ্ধ করতে চায়। প্রকৃত সাধক এসবকে ঠিক সেই ব্রজ বালাদের মতো তুচ্ছ করে অগ্রসর হন।
★ জয় রাধে ★


No comments:
Post a Comment